এই আর্টিকেলটি ফটোগ্রাফিতে মোটামুটি নতুন কিন্তু আগ্রহী এমন মানুষদের জন্য লিখার চেষ্টা করেছি। ফটোগ্রাফির জগতে একটা ছোট খাট ট্যুর দেয়ার চেষ্টা করা হবে এই ব্লগে। আশা করি, অস্পষ্ট ধারনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়া যাবে।
এছাড়া বিভিন্ন কমন প্রশ্নগুলোর উত্তরও দেয়ার চেষ্টা করেছি। এটা বলে নেয়া আবশ্যক, ফটোগ্রাফির সীমা অসীমে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাও ব্যাসিকটুকু খুবই সহজ। এটুকু জানা থাকলে জটিল জগতে ঢোকার পথটা অনেকটাই সুগম হয়ে যাবে।
ফটোগ্রাফি কি?
ফটোগ্রাফি একটা শিল্প, একটা ডিজিটাল সেন্সর বা ফিল্মের মাধ্যমে একটা ক্যামেরা দিয়ে আলোকিত কোন বস্তুকে চিত্রিত করার শিল্প। এই শিল্প কতটা সুন্দর হবে তা নির্ভর করে শিল্পীর কল্পনা এবং ক্যামেরা ব্যবহারের দক্ষতার উপর। দুটোর একটিও যদি না থাকে তাহলে সুন্দর ফটোগ্রাফ নিয়ে আনা খুবই দূষ্কর। কারন, কল্পনাশক্তি ভালো হলেও যদি ক্যামেরায় দক্ষতা না থাকে তাহলে কাঙ্ক্ষিত ছবিটি কোন ভাবেই চিত্রায়িত করা সম্ভব হয় না।
পৃথিবীর প্রথম স্থায়ী ছবিটা ক্যাপচুর করেন ফ্রান্সের জোসেফ নিফকোর ১৮২৬ সালে (মতান্তরে ১৮২৭) যেই ছবিতে একটা বিল্ডিং এর ছাদকে চিত্রায়িত করা হয়েছিল। নিচে ছবিটি দেয়া হলো।

এর পরে আমরা অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়েছি। পৃথিবী ছাড়িয়ে চাঁদ, মঙ্গলের ছবিও তুলে এনেছি। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ছবি তোলা এখন হয়ে উঠেছে সহজতর। আমাদের শুধু জানতে হবে আমরা কি তুলতে চাই, বাকি কাজ অনেকটুকুই প্রযুক্তি করে দেয়।

ফটোগ্রাফি শুরু করার জন্য কি কি প্রয়োজন?
অবশ্যই প্রথমে যেটি লাগবে সেটি হলো একটি ক্যামেরা! সেটি হতে পারে ফোনের ক্যামেরা কিংবা এসএলআর বা ডিএসএলআর। তবে ফটোগ্রাফির ব্যাসিকগুলো জানা থাকলে ফোন দিয়েই অত্যন্ত ভালো ছবি তুলে ফেলা যায়। এছাড়া, ফটোগ্রাফিতে আলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই যদি ঘরের ভেতর ফটোগ্রাফি করতে চান আলোর সোর্স এর দিকেও একটু তাকাতে হবে। এছাড়া অনেক অনেক উপকরন আছে, কোনটা আপনার লাগবে তা নির্ভর করবে আপনি কি ধরনের ফটোগ্রাফি করতে চান তার উপর।
এবার একটা একটা করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্যামেরা সেটিংস নিয়ে আলোচনা করা যাক।
এক্সপোজার: এক্সপোজার হলো ক্যামেরায় কতটুকু আলো প্রবেশ করবে, ছবিটি কতটুকু আলোকজ্জ্বল হবে, সেন্সর কতটুকু আলোক সংবেদনশীল হবে তার প্রকাশক। শাটার স্পিড, এপারচার, ISO এই তিনটি ফ্যাক্টর মিলে ক্যামেরার এক্সপোজার তৈরি করে। এবং এটাই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। শাটার স্পিড, এপারচার, আইএসও এই তিনটাকে একত্রে এক্সপোজার ট্রায়াংগেল দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কারন এরা প্রত্যেকেই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এই তিনটার সংজ্ঞা জেনে আসার পর এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

এপার্চার: এটা হলো লেন্সের মধ্যকার গর্ত। যেটা দিয়ে আলো লেন্সের মধ্যে প্রবেশ করে। এপার্চার যত বেশি হবে, তত বেশি আলো লেন্সের মধ্য দিয়ে সেন্সরে প্রবেশ করবে।
এটা প্রকাশ করা হয় f নাম্বার দিয়ে। এটা আবার একটু বিপরীত। F/number যত বেশি হবে তত কম খোলা হবে লেন্সের এপার্চার। আর f/number যত কম হবে তত বেশি খোলা হবে লেন্সের এপার্চার। যত বেশি খোলা হবে লেন্সের এপার্চার, তত বেশি আলো প্রবেশ করতে পারবে।
এটির সাথে আবার ডেপথ অফ ফিল্ডের সাথে সম্পর্কিত। ডেপথ অফ ফিল্ড হলো কতটুকু অংশ ফোকাসে থাকবে তা। এপার্চার যত কম হবে ডেপথ অফ ফিল্ড ও কমে যাবে। ফলে, কম এপার্চারে একটা শ্যালো ডেপথ অফ ফিল্ড পাওয়া যায়। যাকে আমরা বুকেহ ইফেক্টও বলে থাকি।

শাটার স্পিড: ক্যামেরার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শাটার, যেটি ক্যামেরা সেন্সরকে ঢেকে রাখে, ছবি তোলার সময় একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলে, আলোকে প্রবেশ করতে দেয়, আবার বন্ধ হয়ে যায়। শাটারটি কত সময়ের জন্য খোলা থাকবে সেটিই শাটার স্পিড। যদি বেশি সময়ের জন্য খোলা থাকে আলোও বেশি প্রবেশ করবে, কম সময়ের জন্য খোলা থাকলে আলোও কম প্রবেশ করবে। মোশন ইফেক্টে শাটার স্পিডের কিছু কাজ আছে, যেমন ফ্রিজিং মোমেন্ট বা স্পোর্টস ফটোগ্রাফিতে শাটার স্পিড বেশি ব্যবহার করা হয়, নাইট ফটোগ্রাফি, বা মোশন ব্লার আনতে বেশি শাটার স্পিড ব্যবহার করা হয়।

ISO: আইএসও হলো ক্যামেরার সেন্সরের সেন্সিটিভিটি। অর্থাৎ তা আলোর প্রতি কতটা সংবেদনশীল হবে। ISO বাড়িয়ে দিলে কম আলোতেও ক্যামেরা অনেক কিছু দেখতে পায়। তবে এখানে একটা সমস্যা আছে। ISO বেশি দিলেই ছবিতে এক ধরনের নয়েজ চলে আসে। যেটা ছবিকে সত্যিকার অর্থে খারাপ করে দেয়। এবং নয়েজ রিমোভালের কোন স্বীকৃত পদ্ধতিও নেই। তাই যত কম ISO তে শুট করা যায় ততই ভালো।
একবার আপনি অ্যাপারচার, শাটার স্পিড এবং আইএসও বুঝতে পারলে এক্সপোজারের এই উপাদানগুলির প্রতিটি কীভাবে কাজ করে তা শিখতে হবে।
ফটোগ্রাফির এই সমস্ত বুনিয়াদিগুলির জন্য, এক্সপোজারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এক্সপোজার সম্পর্কে পুরো ধারনা থাকলে ফ্রেমিং, লাইটিং ইত্যাদিতে মনোযোগ দেয়া যায়।

একটু সামারি করা যাক, এপার্চার যত বাড়বে ( বা f. যত কমবে) আলো তত বেশি প্রবেশ করবে, ডেপথ অফ ফিল্ড তত কম হবে। আলো বেশি প্রবেশ করতে পারলে আইএসও ও কিছুটা কম রাখা যায়। আবার শাটার স্পিড যত বাড়বে তত কম আলো প্রবেশ করবে ফলে এপার্চার আর আইএসও বাড়াতে হবে। মূলত এপার্চার আর শাটার স্পিডের উপর নির্ভর করে আইএসও পরিবর্তন করতে হয়। কারন আমাদের সবসময়ই চেষ্টা থাকবে যাতে আইএসও সবচেয়ে কম রাখা যায়।
এবার ক্যামেরার কিছু ব্যাসিক ফিচার নিয়ে আলোচনা করি।
ডেপথ অফ ফিল্ড: এটা হলো ছবি তোলার সময় কতটুকু অংশ ফোকাসে থাকবে। এই অংশটুকুর সামনের অংশও ব্লার হয়ে যাবে, পেছনের অংশটুকুও ব্লার হয়ে যাবে। এই অংশটুকুই শুধু শার্প ফোকাসে থাকবে। এপার্চার বাড়ালে ডেপথ অফ ফিল্ড কমে একই ভাবে লেন্সের ফোকাল লেঙথ বাড়লেও ডেপথ অফ ফিল্ড কমে যায়।


ফোকাল লেংথ: সাধারনত মিলিমিটারে প্রকাশ করা হয়। এটি হলো লেন্সের অপটিক্যাল ডিস্টেন্সের একটা পরিমাপ। একটা হালকা আলো লেন্সে প্রবেশের পর যত দূরত্বে ক্যামেরার ফোকালে ডিজিটাল সেন্সরে বা ৩৫ মিমি ফিল্মে একটা শার্প চিত্র তৈরি করে, সেটাই ফোকাল লেংথ।

ফোকাল লেঙথ যত বেশি হবে সেটি তার অপটিকেল ডিসট্যান্স তত বেশি, সেটি তত দূরের বস্তুকে কাছে থেকে দেখাতে পারে। যেমন জুম লেন্স গুলোর ফোকাল লেঙথ অনেক বেশি হয়ে থাকে। ফোকাল লেংথ বাড়ার সাথে সাথে ডেপথ অফ ফিল্ডও কমতে থাকে। তাই জুম লেন্স গুলো দিয়ে শ্যালো ডেপথ অফ ফিল্ডের ছবি তোলা যায়।
হোয়াইট ব্যালেন্সঃ হোয়াইট ব্যালেন্স (ডাব্লুবি) হ’ল অবাস্তব রঙের ক্যাসেটগুলি সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া, যাতে ব্যক্তি হিসাবে সাদা দেখা যায় এমন জিনিসগুলি আপনার ফটোতে সাদা হয়। সঠিক ক্যামেরা সাদা ভারসাম্যকে আলোর উৎসের “রঙের তাপমাত্রা” বিবেচনা করতে হবে, যা সাদা আলোর আপেক্ষিক উষ্ণতা বা শীতলতা বোঝায়। বিভিন্ন আলোক উত্সের অধীনে সাদা কী তা বিচার করার জন্য আমাদের চোখগুলি খুব ভাল, তবে ডিজিটাল ক্যামেরাগুলি প্রায়শই অটো হোয়াইট ব্যালেন্স (এডাব্লুবি) – এর ক্ষেত্রে খুব অসুবিধা হয় – এবং নীল, কমলা বা এমনকি সবুজ রঙের ক্যাসেট তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল হোয়াইট ব্যালেন্স বোঝা আপনাকে এই রঙের কাস্টগুলি এড়াতে সহায়তা করতে পারে, যার ফলে আলোকসজ্জার বিস্তৃত শর্তের অধীনে আপনার ফটোগুলি উন্নত করতে পারে।

মোটামুটি ফোটোগ্রাফির ব্যাসিক টার্ম গুলো নিয়ে আইডিয়া দেয়া হলো। পরের কোন আর্টিকেলে এগুলো দিয়ে কিভাবে কাজ করবেন, কিভাবে সমন্বয় করবেন, বিভিন্ন ধরনের ছবির জন্য বিভিন্ন এক্সপোজার কম্বিনেশন, কালার গ্রেডিং ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
ছবি সোর্সঃ গুগল



2 thoughts on “ফটোগ্রাফি ব্যাসিক এবং অন্যান্য ১”
অনেক কিছু জানলাম।আপনাকে ধন্যবাদ এরকম ইনফরমেটিভ পোস্টের জন্য।
অসাধারণ পোস্ট। ফটোগ্রাফি সম্পর্কে ধারণাই পালটে গেল।