loader image

চিরকুট লেখার নিয়ম: কীভাবে লিখবেন, কী লিখবেন (১৫টা নমুনাসহ)

ক্লাসের পেছনের বেঞ্চ থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ হাতে হাতে ঘুরে আপনার কাছে এসেছে, এমন ঘটনা অনেকেরই মনে আছে। খোলার আগেই বুকের ভেতর ধুকপুক। ভেতরে হয়তো দুই লাইন, কিন্তু ওই দুই লাইনের জন্য কেউ কলম খুঁজেছে, কাগজ ছিঁড়েছে, ভাঁজ করেছে, আর সবার চোখ বাঁচিয়ে পাঠিয়েছে।

এখন আমরা “ok”, “hmm” আর একটা ইমোজি পাঠাই। সুবিধা আছে, মানছি। কিন্তু কাউকে সত্যিকারের কিছু বলতে চাইলে মেসেজে কেমন আটকে যায়। কথাটা লম্বা হলে মনে হয় বেশি হয়ে গেল, ছোট হলে মনে হয় কিছুই বলা হলো না।

এই জায়গাতেই চিরকুট কাজে আসে। কয়েক লাইন, নিজের হাতে লেখা, নিজের হাতে দেওয়া। এই লেখায় দেখব বসলে কী কী ভাবতে হয়, কোথায় শুরু করবেন, কোথায় থামবেন, আর মা থেকে বন্ধু পর্যন্ত নানা মানুষের জন্য ১৫টা নমুনা। নমুনাগুলো নিজের মতো করে বদলে নেবেন। হুবহু তুলে দিলে মজাটা থাকে না।

চিরকুট আসলে কী?

ছোট্ট হাতে লেখা বার্তা, ব্যস। চিঠির মতো লম্বা সম্বোধন, ভূমিকা আর “ইতি” লাগে না। একটা কথা বলার জন্য এক টুকরো কাগজ।

চিঠি লিখতে বসতে হয়, মেজাজ লাগে, সময় লাগে। চিরকুট লেখা যায় চায়ের কাপ ঠান্ডা হওয়ার আগেই। তাই বছরে একটা বড় চিঠির বদলে মাঝেমধ্যে একটা ছোট চিরকুট লেখা অনেক সহজ, আর পাওয়ার দিক থেকেও কম মূল্যবান না।

কখন লিখবেন?

জন্মদিন আর বার্ষিকীর কথা সবার মাথায় আসে। এর বাইরেও কিছু সময় আছে:

  • জন্মদিন বা বার্ষিকীতে, উপহারের সঙ্গে
  • ঈদে, সালামির খামের ভেতর
  • পরীক্ষা, ইন্টারভিউ বা বড় কোনো দিনের আগের রাতে
  • ঝগড়ার পর, যখন মুখে সরি বলাটা গলায় আটকে যাচ্ছে
  • কেউ পাশে ছিল, অথচ ধন্যবাদটা বলা হয়নি
  • কোনো বন্ধু বা সহকর্মী নতুন শহরে চলে যাচ্ছে
  • কোনো কারণ ছাড়াই। মায়ের টিফিন বক্সে, বাবার ব্যাগের চেইনে, ভাইয়ের বইয়ের ভাঁজে

কারণ ছাড়া পাওয়া চিরকুটই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।

লেখার আগে চারটা প্রশ্ন

কলম হাতে নেওয়ার আগে একটু ভেবে নিন।

প্রথম প্রশ্ন, কাকে লিখছেন? নামটা নয়, মানুষটার মুখটা মনে আনুন। সে যখন পড়বে, তখন কোথায় বসে থাকবে, কেমন মুখ করে থাকবে। সবার জন্য লেখা চিরকুট কারও গায়ে লাগে না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, কোন কথাটা বলতে চান? ধন্যবাদ, ভালোবাসা, সরি, নাকি শুধু “তোমার কথা মনে পড়ছে”? একটা বেছে নিন। সব কথা এক কাগজে ঢোকাতে গেলে একটাও ঠিকমতো পৌঁছায় না।

তৃতীয় প্রশ্ন, এমন কোনো ঘটনা মনে পড়ে, যা শুধু আপনারা দুজন জানেন? এটাই চিরকুটের প্রাণ। “তুমি অনেক ভালো” সবাই বলে। কিন্তু “সেদিন বৃষ্টিতে তুমি ছাতাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিলে” শুধু আপনি বলতে পারেন।

চতুর্থ প্রশ্ন, কোথায় থামবেন? চার থেকে ছয় লাইনের মধ্যে। ছোট বলেই চিরকুট পড়া হয়, আর বারবার পড়া হয়।

একটা চিরকুট ধাপে ধাপে বানিয়ে দেখি

ধরুন, আপনার প্রিয় মানুষটাকে কিছু একটা লিখতে চান। প্রথমবার যা মাথায় আসে, তা হয়তো এরকম:

তুমি আমার জীবনে অনেক স্পেশাল। তোমাকে অনেক ভালোবাসি। সবসময় পাশে থেকো।

কথাগুলো মিথ্যে না। কিন্তু এই লাইন তিনটা পৃথিবীর যে কেউ যে কাউকে লিখতে পারে। তাই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “কখন আমি সবচেয়ে বেশি টের পাই যে ও আমার কাছে কতটা জরুরি?” উত্তরটা হয়তো খুব ছোট কিছু। সকালের চা, রাতের ফোন, রিকশায় পাশে বসে থাকা। সেটাই লিখে ফেলুন:

আজ সকালে চা বানাতে গিয়ে আবার দুই কাপ নিয়ে ফেললাম। অভ্যাসটা কবে হয়ে গেল, টেরই পাইনি।

দ্বিতীয়টায় “ভালোবাসি” শব্দটাই নেই, অথচ কথাটা আগের চেয়ে অনেক জোরে পৌঁছায়। বুঝিয়ে বলার চেয়ে দেখিয়ে দেওয়া সবসময় বেশি কাজ করে।

শুরু আর শেষ

শুরুতে “প্রিয়…” বা “শ্রদ্ধেয়…” লাগে না। যে নামে ডাকেন, সেটা দিয়েই শুরু করুন। ডাকনাম হলে আরও ভালো। আবার কিছু না লিখে সরাসরি কথাতেই ঢুকে পড়লেও চলে, চিরকুটে এটা মানায়।

শেষটা নিয়ে ভাবুন একটু। “ইতি” টানার দরকার নেই। একটা ছোট বাক্য দিয়ে থামতে পারেন, যেমন “খেয়ে নিস”, “ফোন দিও”, “ঈদ মোবারক”, কিংবা শুধু নিজের নাম। যা স্বাভাবিক লাগে, তাই।

১৫টা নমুনা

এগুলো ছাঁচ হিসেবে দেখুন। নিজের ঘটনা বসিয়ে নিলেই এগুলো আপনার হয়ে যাবে।

ভালোবাসার মানুষকে

১. আজ সকালে চা বানাতে গিয়ে দুই কাপ নিয়ে ফেললাম। অভ্যাসটা কবে হয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি। তুমি পাশে না থাকলেও আমার সকালটা তোমাকে ছাড়া শুরু হয় না।

২. (দূরে থাকা কাউকে) তোমার শহরে এখন কয়টা বাজে জানি না। আমার এখানে সন্ধ্যা নেমেছে, আর তোমার কথা মনে পড়ছে। ফিরে এলে বলার মতো অনেক গল্প জমে আছে।

৩. (বার্ষিকীতে) কত বছর হলো, হিসাব রাখিনি। শুধু জানি, ঝগড়ার পরের চুপচাপ সন্ধ্যাগুলোও তোমার সঙ্গে কাটাতে আমার আপত্তি নেই। আরও কিছুদিন সঙ্গে থেকো।

পরিবারের জন্য

৪. (মাকে) ফোনে “ঠিক আছি” বলাটা তোমার কাছ থেকেই শেখা। এবার সত্যিটা বলি: তোমার রান্নার চেয়েও বেশি মিস করি “খেয়েছিস?” জিজ্ঞেস করাটা।

৫. (বাবাকে) তুমি কখনো বেশি কিছু বলোনি। কিন্তু রাত করে ফিরলেও দরজাটা খোলা পেয়েছি, এটা আমি খেয়াল করেছি। ধন্যবাদটা মুখে বলতে পারি না, তাই এই কাগজ।

৬. (ছোট ভাই-বোনকে ঈদে) সালামির খামের সঙ্গে এই চিরকুটটাও ফ্রি। আইসক্রিম কিনে ফেলার আগে এটা পড়বি। ঈদ মোবারক।

৭. (বড় ভাই বা আপুকে) ছোটবেলায় তোমার জামা, তোমার কলম, সবকিছুতে ভাগ বসিয়েছি। রাগ করেছ, তবু দিয়েছ। এখন আমি বড় হয়েছি, এবার আমার পালা। যা লাগে, বলো।

বন্ধুর জন্য

৮. (জন্মদিনে) তোর বয়স বাড়ছে, কিন্তু বুদ্ধি বাড়ছে না, এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। এরকমই থাকিস। আর কেক কাটার সময় আমার টুকরোটা যেন বড় হয়।

৯. (বিদায়ের সময়) ক্যান্টিনের ওই কোণের টেবিলটা তোকে ছাড়া আর আগের মতো থাকবে না। যেখানেই যাস, আড্ডার একটা চেয়ার তোর নামে খালি রাখলাম।

১০. (পরীক্ষার আগে) যা পড়েছিস, তা-ই যথেষ্ট। যা পড়িসনি, তা নিয়ে এখন ভাবিস না। পরীক্ষা শেষে আমার পক্ষ থেকে বিরিয়ানি।

১১. (নতুন শহরে বা নতুন চাকরিতে যাচ্ছে যে) প্রথম কয়েকদিন সব অচেনা লাগবে, লাগুক। তুই ঠিক মানিয়ে নিবি। বাসার খাবারের জন্য মন খারাপ হলে ফোন করিস, আমি আছি।

কৃতজ্ঞতা আর ক্ষমা

১২. (ধন্যবাদ) সেদিন তুমি কিছু বলোনি, শুধু পাশে বসে ছিলে। ঠিক ওইটুকুই আমার দরকার ছিল। মুখে বলা হয়নি, তাই লিখে দিলাম।

১৩. (ক্ষমা) সরি বলতে গেলে গলায় আটকে যায়, তাই কাগজে লিখছি। ভুলটা আমার ছিল। রাগ করে থাকলে বুঝি, তবে বেশিদিন থেকো না।

১৪. (শিক্ষককে) স্যার, আপনার ক্লাসেই প্রথম বুঝেছিলাম, না বুঝলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কথাটা এখনও সঙ্গে আছে। ধন্যবাদ।

১৫. (বিয়ের উপহারের সঙ্গে) তোমাদের নতুন সংসারে ঝগড়া হবে, চায়ের কাপ নিয়েও হবে। এটা স্বাভাবিক। শুধু ঘুমানোর আগে মিটিয়ে নিও। অনেক ভালো থেকো।

লিখতে লজ্জা লাগলে

অনেকেরই লিখতে বসে হাত কাঁপে, বিশেষ করে ভালোবাসার কথায়। কয়েকটা জিনিস কাজে দেয়।

প্রথমে একটা খসড়া করুন, ফোনের নোটে বা ছেঁড়া কাগজে। ওটা কেউ দেখবে না। তারপর যা বাড়তি লাগছে কেটে ফেলুন। বেশিরভাগ সময় প্রথম আর শেষ লাইনটাই বাদ দিলে চিরকুট ভালো হয়ে যায়।

আর মনে রাখুন, চিরকুট দেওয়ার সময় সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে শোনাতে হবে না। রেখে দিলেই হয়। পড়ার ঝামেলাটা ওদের।

কাগজ, কলম আর খাম

হাতের লেখা ভালো না, এ নিয়ে ভয় পাবেন না। একটু আঁকাবাঁকা অক্ষরেই চিরকুটকে চিরকুট মনে হয়। তবে কাগজ আর কলমে কয়েকটা ছোট জিনিস খেয়াল রাখলে ভালো হয়:

  • চকচকে কাগজে বলপয়েন্ট কলম ছড়িয়ে যায়। একটু মোটা, ম্যাট কাগজ বেছে নিন।
  • জেল পেনের কালি শুকাতে সময় নেয়। লিখে সঙ্গে সঙ্গে ভাঁজ করলে পাশের অংশে লেগে যেতে পারে।
  • ভয় পেলে আগে হালকা পেনসিলে লাইন টেনে নিন, পরে মুছে দিন।
  • মাপ পোস্টকার্ডের সমান বা তার চেয়ে ছোট রাখুন। বড় কাগজে চার লাইন লিখলে ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

কোথায় রাখবেন, কীভাবে দেবেন

লেখার চেয়েও মজার কাজ হলো লুকিয়ে রাখা। এমন জায়গা বেছে নিন, যেখানে সে নিজে থেকে খুঁজে পাবে:

  • বইয়ের ভাঁজে
  • ব্যাগের সামনের চেইনে
  • কফির কাপ বা টিফিন বক্সের নিচে
  • উপহারের ভেতরে, সবার নিচে
  • কুরিয়ারে পাঠালে, প্যাকেটের একদম ওপরে

যাকে দিচ্ছেন, সে কখন কী করে, তা আপনি জানেন। সেই সময়টা ভেবে জায়গা ঠিক করুন।

হাতে আঁকা খামে দিলে

একই কথা খাতার ছেঁড়া পাতায় আর পছন্দ করা কাগজে খামে ভরে দিলে আলাদা লাগে, কারণ খামটা খোলার মুহূর্তটাও তখন উপহারের অংশ।

আমরা রাঙ-এ হাতে এঁকে খাম আর চিরকুটের সেট বানাই। এগুলো দেখতে পারেন:

সবগুলো এক জায়গায় দেখতে চাইলে খামের কালেকশনে যান। মনের মতো ডিজাইন না পেলে নিজের আইডিয়া জানান, কাস্টম ডিজাইনও করা হয়। ডেলিভারি সারা বাংলাদেশে, কুরিয়ারের মাধ্যমে।

[এখানে চাইলে রাঙ-এর কোনো সত্যিকারের অর্ডারের ছোট একটা গল্প, বা কোনো ক্রেতার অনুমতি নেওয়া কথা বসাতে পারেন। না বসালে এই লাইনটা মুছে দিন।]

যা না করলেই ভালো

  • ইন্টারনেট থেকে কবিতা বা ক্যাপশন হুবহু তুলে দেওয়া। সুন্দর হবে, কিন্তু আপনার হবে না।
  • এক কাগজে সব কথা বলতে চাওয়া। একটা কথা বলুন, বাকিটা পরের চিরকুটে।
  • ভারী শব্দ ব্যবহার করা। যেভাবে কথা বলেন, সেভাবেই লিখুন।
  • বানান ভুলের ভয়ে না লেখা। ভুল বানানের চিরকুটও কেউ ফেলে দেয় না।

প্রশ্ন ও উত্তর

চিরকুট কত লাইনের হওয়া ভালো?

চার থেকে ছয় লাইনই ঠিক আছে। একটা কথা, একটা ছোট ঘটনা, তারপর থেমে যাওয়া।

চিরকুট কি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য?

না। মা, বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু, শিক্ষক, যে কাউকে লেখা যায়। ঈদে, জন্মদিনে, বা কোনো কারণ ছাড়াই।

হাতের লেখা খারাপ হলে কী করব?

তবু হাতেই লিখুন। ছাপা লেখার চেয়ে হাতের লেখা বেশি ব্যক্তিগত লাগে, লেখা যেমনই হোক।

বাংলায় লিখব, নাকি ইংরেজিতে?

যে ভাষায় আপনি আসলে কথা বলেন, সেটায়। অনেকে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে বলে, চিরকুটেও তা-ই লিখলে ক্ষতি নেই।

কুরিয়ারে পাঠালে চিরকুট কীভাবে দেব?

চিরকুটটা সবার শেষে লিখে খামে ভরে প্যাকেটের একদম ওপরে রাখুন, যাতে প্রথমেই চোখে পড়ে।

রাঙ থেকে কি সারা বাংলাদেশে অর্ডার পাঠানো হয়?

হ্যাঁ, কুরিয়ারের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ডেলিভারি দেওয়া হয়।

শেষ কথা: আজই কাউকে একটা চিরকুট লিখে ফেলুন। তিন লাইন হলেও চলবে। কার জন্য লিখবেন, সেটা আপনার এখনই মনে পড়ে গেছে, তাই না?

2 thoughts on “চিরকুট লেখার নিয়ম: কীভাবে লিখবেন, কী লিখবেন (১৫টা নমুনাসহ)”

  1. Pingback: বিয়েতে কী উপহার দেবেন: বন্ধু, ভাইবোন আর নতুন সংসারের ভাবনা

  2. Pingback: হাতে আঁকা সানগ্লাস: কীভাবে বেছে নেবেন ও যত্ন নেবেন | রাঙ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
0
0
Your Cart
Your cart is emptyReturn to Shop
Scroll to Top